পিরোজপুরের তৎকালীন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাঈফ মিজান শহীদ হওয়ার ৫০ বছর আজ

আজ ৫ মে সাঈফ মিজানুর রহমান শহীদ হওয়ার ৫০ বছর । ১৯৭১ সালের ৩ মে ৩২ পাঞ্জাবের ৩ প্লাটুন রক্ত পিপাসুু হানাদার কর্নেল আতিকের নির্দেশে পিরোজপুর শহরে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করলে প্রতিহতের চেষ্টা করতে গিয়ে মীজান গুলিবিদ্ধ হয়ে ধরা পড়েন। ৫ মে শহরের বলেশ্বর খেয়াঘাটের বধ্যভূমিতে নিয়ে তাকে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়।যতবার তাকে আঘাত করা হয়েছে ততবারই তিনি শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ‘জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান দিয়েছেন।

নড়াইলের বিশিষ্ট আইনজীবী ও ২০২১ সালে ভাষা সৈনিক পদক প্রাপ্ত এডভোকেট আফসার উদ্দিন আহমেদ এবং বেগম মতিয়া আহমেদ দম্পতির জৈষ্ঠ্য পুত্র শহীদ সাইফুল বারী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান (এস,বি,এম মিজানুর রহমান) নড়াইল শহরের বর্তমান সাইফ মীজান সড়কের সাইফ ভিলাতে ১৯৪২ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহন করেন।পারিবারিকভাবে রাজনৈতিক পরিবেশেই তিনি বড় হয়েছেন। তাঁর মাতুল ছিলেন বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার স্পিকার ও মন্ত্রী সৈয়দ নওশের আলী। বাবা আফসার উদ্দীন আহমেদ ছিলেন নড়াইলের বিশিষ্ট আইনজীবী ও ব্রিটিশ ভারতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সদস্য এবং পরে আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন। মা মতিয়া আহমেদও ছিলেন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নড়াইলে এলে তাঁদের বাড়িতেই উঠতেন।

এস বি এম মিজানুর রহমান অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ১৯৬৩ সালে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৬৪ সালে এমএ সম্পন্ন করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিল সাহিত্যের প্রতি। দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাবস্থায় তাঁর বই প্রকাশিত হয়। কলেজ জীবন ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করার অপরাধে কারাভোগ করতে হয় তাঁকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল সংসদের নির্বাচনে তিনি পত্রিকা সম্পাদক, পরে সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদেরও সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের অন্যতম সহ-সভাপতি ছিলেন। এমএ পাস করার পর অধ্যাপনা পেশায় যোগ দেন। এ পেশায় থাকাবস্থায় সিএসএস (সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস) পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণও হন। কিন্তু পুলিশ রিপোর্টের কারণে চাকরি পাননি। পরে ইউনাইটেড ব্যাংকে কিছুদিন চাকরি করেন। বাংলায় স্বাক্ষর করার কারণে কর্তৃপক্ষ তাঁকে অভিযুক্ত করলে তিনি ঘৃণাভরে এ চাকরি ছেড়ে দেন। পরে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রাদেশিক সরকারের অধীনে চাকরি নেন। মিজানুর রহমান বিবাহিত ছিলেন। তাঁর কোনো সন্তান ছিল না।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এস বি এম মিজানুর রহমান(সাঈফ মিজান) ছিলেন পিরোজপুর মহকুমার (বর্তমানে জেলা) ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট (ট্রেজারি অফিসার)। মুক্তিযুদ্ধের সূচনাতেই পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পিরোজপুরের জনগণ ও পুলিশ বাহিনীকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন। সাঈফ মিজানুর রহমান ১৭ এপ্রিল ঘোষণা করেছিলেন, ‘আজ থেকে সমগ্র পিরোজপুর মহকুমা স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ হিসেবে পরিগণিত হবে। যাঁরা এখানে বসবাস করতে চান, বাংলাদেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবেই তাঁদের থাকতে হবে। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী যেকোনো মুহূর্তে আমাদের ওপর আক্রমণ চালাবার চেষ্টা করতে পারে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

৫ মে পাকবাহিনী পিরোজপুর আক্রমণ করে। কিন্তু আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সামনে তাঁদের সেই প্রতিরোধ ভেঙে যায়। ওইদিনই তিনি নিখোঁজ হন। পাকবাহিনীরা তাকে আহত অবস্থায় ধরে নিয়ে যায়। সেনারা তাঁকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়। তাঁর মরদেহ পরে আর পাওয়া যায়নি। এসব তথ্য জানা যায় তাঁর ভাই সাইফ ফাতেউর রহমানের রচনা থেকে। তিনি আরও লিখেছেন, ‘১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ মুজিবনগরে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সরকার গঠনের পরই তিনি পিরোজপুরের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ছাত্র,সরকারি কর্মচারী,কৃষক অন্যান্য পেশাজীবী ও স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতায় এক সভার আয়োজন করেন। তখনো পর্যন্ত সমগ্র পিরোজপুর মহকুমা সম্পূর্ণভাবে শত্রুমুক্ত। ওই সভাতেই পিরোজপুরকে স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ৫ মে শুরু হয় যুগপৎ বিমান ও গানবোট আক্রমণ। মরণপণ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মিজান ও তাঁর সাথীরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেননি তাঁরা। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হন।

Thanks to

u71news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *