প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ SOPA পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক ইন্দুরকানীর কাদির

তাওসিফ এন আকবরঃ আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্সের সাবেক বাংলাদেশ ব্যুরোপ্রধান ও প্রধান প্রতিবেদক পিরোজপুরের ইন্দুরকানীর সিরাজুল ইসলাম কাদির।সুদীর্ঘ ২৩ বছর তিনি এই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বার্তাসংস্থার হয়ে বাংলাদেশের খবর সারাবিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।এছাড়াও তিনি কয়েকটি দৈনিক পত্রিকার অর্থনৈতিক রিপোর্টারসহ অর্থনৈতিক বিভাগের দায়িত্বেও ছিলেন।পাশাপাশি অধ্যাপনাওকরেছেন ঢাকার স্বনামধণ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “সরকারি তিতুমীর কলেজে”।

সিরাজুল ইসলাম কাদির এর জন্ম ১৯৫৮ সালে উপজেলার সদর ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে।স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মরহুম আব্দুল কাদির ও মৃত আনোয়ারা বেগম দম্পতির চার মেয়ে ও দুই ছেলে সন্তানের মধ্যে ৩য় তিনি।

শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি মায়ের কাছেই।এরপরে ঘোষেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১৯৭৩ সালে পিরোজপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি সম্পন্ন করেন।হয়ত আনমনে জানতেন সাংবাদিকতায় তিনি অসীমউচ্চতাকে স্পর্শ করবেন।তাই সংক্ষিপ্ত মানবজীবনে সময়ক্ষেপণ না করে এস.এস.সি তে অধ্যয়নরত অবস্থায়ই সাংবাদিকতার সাথে সংযুক্ত হন।এরপর মহৎ এই পেশাটিতে তিনি সেবা দিয়েছেন দীর্ঘ ৪৭ বছর।

১৯৭৩ সালেই সেসময়ের জনপ্রিয় দৈনিক “সংবাদের” পিরোজপুর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন।এইচএসসি’র পর দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সম্পন্ন করেন অনার্স ও মাষ্টার্স ডিগ্রী।ছাত্রজীবনেই সূচনা ঘটে তার কর্মজীবনেরও। দৈনিক “সংবাদের” পিরোজপুর প্রতিনিধি হিসেবে একাধারে ৫ বছর সংযুক্ত ছিলেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমবর্ষের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই ১৯৭৮ সালে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা “কন্ঠস্বর” এ কিছুদিন কাজ করেন।একই বছরে দৈনিক-বাংলা গ্রুপের তৎকালীন মর্যাদাবান “সাপ্তাহিক বিচিত্রায়” প্রথমে স্ট্রিংগার এবং পরবর্তীতে ব্যাংকিং,শেয়ারবাজার,চিত্রকলা ও আলোকচিত্র বিভাগেও কাজ করেছেন তিনি।এই সাপ্তাহিকে সর্বশেষ সম্পাদনা করতেন প্রবাসীদের জন্য বিশেষায়িত “প্রবাস থেকে” পাতা।

বিচিত্রা’র পর ১৯৯২ সালের ১৫ ই আগষ্ট থেকে প্রকাশিত হওয়া সম্ভাবনাময় “দৈনিক বাংলাবাজার” এ অর্থনৈতিক রিপোর্টার হিসেবে প্রথমবার বৃহৎ পরিসরে কাজের সুযোগ পান।এখানে কাজ করেন ১৯৯৭ এর শেষ সময় পর্যন্ত।”বাংলাবাজার” এ নিজের সেরাটা দেয়ার পর ১৯৯৮ সালের শুরুর দিকে প্রকাশিত হওয়া “দৈনিক মানবজমিন” এর প্রকাশনার শুরু থেকেই নিয়মিত প্রতিবেদনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিভাগের দায়িত্বেও ছিলেন সিরাজুল ইসলাম কাদির।এই কাগজে দেশসেরা বিখ্যাত সব অর্থনৈতিক প্রতিবেদন লিখেছেন ২০০৬ সাল পর্যন্ত।

তিনি রাজধানী ঢাকার “সরকারি তিতুমীর কলেজ” এ অধ্যাপনার পাশপাশি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকর্পোরেশনের প্রকাশনা কর্মকর্তা হিসেবেও কয়েক বছর চাকুরি করেছেন।এরপরে তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বার্তাসংস্থা “রয়টার্সে” প্রথমে স্ট্রিংগার ও পরে প্রতিবেদক হিসেবে সাংবাদিকতার সুযোগ পান।সুনিপুণ প্রতিবেদন এবং নিষ্ঠার সাথে কাজের একপর্যায়ে তিনি এই সংস্থাতেই ভারপ্রাপ্ত ব্যুরোপ্রধান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যুরোপ্রধান ও প্রধান প্রতিবেদক নিযুক্ত হন।সবমিলিয়ে “রয়টার্সে” তার রয়েছে দীর্ঘ ২৩ বছরের অভিজ্ঞতা।

স্কুলজীবনে তিনি দেশাত্মবোধক কবিতা রচনার জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেন।যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিমন্ত্রণে ২০০২ সালে মাসব্যাপী দেশটি সফরকালে সেদেশের সরকার তাকে সম্মান সূচক নাগরিকত্ব প্রদান করে।চীন ও ভারত সরকারের নিমন্ত্রণে দেশদুটিতেও কয়েকবার সফর করেছেন।

রয়টার্সে দায়িত্ব পালনকালে রানা প্লাজার হৃদয় বিদারক ভবন ধ্বসের উপর সিরিজ রিপোর্ট করার জন্য বার্তাসংস্থাটির সম্পাদক মন্ডলীর মাসের সেরা প্রতিবেদক হিসেবে সম্মানিত ও পুরস্কৃত হন।এছাড়াও হ্যাকারদের হাতে বাংলাদেশ বাংকের রিজার্ভের অর্থ-ডাকাতির উপর সিরিজ রিপোর্ট করার জন্য এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ SOPA (The Sociecity of Publishers’ Association) পুরস্কারে ভূষিত হন।হংকং বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক এই পুরস্কার এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাংবাদিকদের মাঝে পুলিৎজার পুরষ্কারের সাথে তুলনা করা হয়।রিজার্ভের অর্থ-ডাকাতির এই প্রতিবেদন রচনার জন্য তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনারে বক্তৃতা দেয়ার আমন্ত্রণ পান।এই বিষয়ের উপর তিনি রয়টার্সের অন্যান্য সহকর্মীসহ অন্তত ৩০টি রিপোর্ট করেন।

অতিসাম্প্রতি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের পক্ষ থেকে তাদের গবেষণা কাজের জন্য এই রিপোর্টের উপর ঘন্টাব্যপী সাক্ষাৎকার গ্রহন করা হয়।পেশাদারিত্ব নাকি মানবতা,কোনটার দাবি সাংবাদিকের কাছে উঁচুতে? এমন প্রশ্নে দেশসেরা এই সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব জানিয়েছেন “এটি অমীমাংসিত এবং একইসাথে বিতর্কিত বিষয়; যার স্বতঃসিদ্ধ কোন উত্তর দেয়া সম্ভব নয়।পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতা অনুযায়ী কখনো কখনো পেশাদারিত্বকে আবার কখনো মানবিকতাকে গুরুত্ব দিতে হয়।

বর্তমানে তিনি আমেরিকান চেম্বার’স জার্নালের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী ও দুই পুত্রসন্তান নিয়ে তার সংসার।স্ত্রী রোকসানা রাব্বানী বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এইচআর বিভাগে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন। স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার পর তিনি একটি সঙ্গীত স্কুলে নজরুল গানের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।বড় ছেলে রিয়াসাত সাকিফ কাদির মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পানি ও বর্জ্য জল প্রকৌশলী।পুত্রবধূ একজন ডাক্তার এবং আমেরিকার মেরিল্যান্ডের জন হপকিন্স মেডিকেল স্কুলের গবেষণা সহযোগী।ছোট ছেলে রিফায়াত সাবিত কাদির কর্মরত আছেন কানাডার ক্যালগরির একটি ফার্মাসিউটিক্যাল ফার্মে ডেটা-অ্যানালিস্ট হিসেবে।

আন্তর্জাতিক পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক সিরাজুল ইসলাম কাদির মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন; নিজের প্রতি দায়বদ্ধতাবোধ থেকে পরিশ্রম,অনুশীলন এবং নিষ্ঠার সাথে নিজেকে প্রস্তুত করে লক্ষ্যের দিকে অবিচল থাকলেই সাফল্য পাওয়া যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *