তাওসিফ এন আকবর
শারিরীক প্রতিবন্ধকতার জন্য দায়ী নন মোঃ মেহেদী হাসান শুভ(৩০)। প্রকৃতির খেয়ালে মানুষের ভাবনার অতীত অনেক কিছু ঘটে। হাসান’র বেলায়ও তাই হয়েছে। তিনি জন্মেছেন দুই হাতে ত্রুটি নিয়ে। তার জন্য প্রকৃতি এই নিষ্ঠুরতাখানি জমা রেখেছিল। তবে জীবনযুদ্ধে হারতে চাননি তিনি। শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ছোটবেলায় সিদ্ধান্ত নেন, লেখাপড়া করে বড় হবেন। পরিবারের সবার উৎসাহ আর সহযোগিতায় শুরু হওয়া তার সেই জীবনসংগ্রাম এখনো অব্যাহত।
পিরোজপুর শহরের ১০ নং শেখ পাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রশিদ-কুরছিয়া বেগম দম্পতির সন্তান মোঃ মেহেদী হাসান শুভ।
অসম্ভবকে সম্ভব করে যারা সকল বাঁধা-বিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতাকে উৎরে শিক্ষা জীবনের একটা স্তরে পৌঁছেছেন তিনিও তাদেরই একজন।অদম্য মনোবল আর ইচ্ছাশক্তির জোরে শারীরিক বাধা ডিঙিয়েও কতটা অজেয় হয়ে ওঠা যায়, পিরোজপুরের এই যুবক যেন তারই উদাহরণ।
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধকতার শিকার শিক্ষার্থীদের খুব কম অংশই উচ্চশিক্ষার পর্যায় পর্যন্ত পড়াশোনা করার সৌভাগ্য লাভ করে। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে তাদের পড়াশোনার যে সুযোগ রয়েছে তার প্রায় পুরোটাই প্রাথমিক কিংবা বড়জোর মাধ্যমিক পর্যন্ত। কিন্তু এরপর থেকে খুব শক্ত মনের জোর না থাকলে তাদের জন্য পড়ালেখা করাটা খুবই কঠিন।
তবুও মা কুরছিয়া বেগমের হার না মানা ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তিনি (হাসান) প্রথম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণি, এরপরে এস.এস.সি তে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করেন আব্দুস সালাম তালুকদার (এ.এস.টি) একাডেমিতে। এইচ.এস.সি ও স্নাতকে উত্তীর্ণ হয়েছেন সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ, পিরোজপুর থেকে।এছাড়াও তিনি বরিশাল বি.এম কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে (গণিত) অধ্যয়ন করেছেন।
জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার তিনি। এ কারণে ছোটবেলা থেকেই কিছুটা কষ্ট আর দুর্ভোগের মধ্যে জীবনের চাকা ঘুরছে তার। তবুও মানসিকভাবে তিনি স্বপ্ন দেখেন আকাশ ছোঁয়ার।
সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে বর্তমানে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত “হাসান’স (Has@an’s) একাডেমিক কেয়ার” নামে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করছেন। পাশাপাশি তিনি আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান “প্রাইম ব্যাংক” এর স্থানীয় এজেন্ট ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
তিনি শুধু নিজেই আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করেননি; পাশাপাশি অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য সেচ্ছাসেবা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন।
এতদঞ্চলে ব্যতিক্রমীসব স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগের জন্য পরিচিত “হ্যাবিট্যাট ডেভলপমেন্ট ট্রাস্ট (এইচ.ডি.টি)” এর পরিচালক হিসেবে নানাবিধ সামাজিক উন্নয়ন, স্বেচ্ছাসেবী সহায়তা ও সহযোগিতামূলক প্রকল্প পরিচালনা করেন।আছেন “বাবুই” সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে।এছাড়াও কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন পিরোজপুরের একমাত্র সাহিত্য বিষয়ক প্রকাশনা “বাবুই” সাহিত্য পত্রিকার।
এতসব প্রতিবন্ধকতার পরেও পড়াশোনা করেছেন, সাইক্লিং, ট্রাভেলিং করেন, উদ্যোক্তা হয়েছেন,নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। ঘোর অন্ধকার কাটিয়ে আলোকবর্তিকা ফেরানো এই মানুষটি স্বপ্ন দেখেন একটা মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে যেখানে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ সম-অধিকার নিয়ে পড়াশোনার সমান সুযোগ পাবে।
তিনি স্বপ্ন দেখেন; পৃথিবীটা হোক মানুষের।সকলে বাঁচুক সকল সুযোগ সুবিধা নিয়ে।দিনশেষে বিশ্বাস করেন মানুষের অধিকার সমতায়।
