তাওসিফ এন আকবর
আজ যেই গোলাপটি নবম বছরে পদার্পণ করেছে তা অঙ্কুরিত হয়েছিল সেই ২০১১ সালে। দুজনের প্রথম দেখা ও প্রথম পরিচয় সেবছরেই। “মন ফড়িংয়ের গল্প” সে-ই শুরু।
এরপর ছেলেটির বরিশালে পড়তে যাওয়ায় না চাইতেও বাড়ে যোগাযোগহীনতা। চলিত পৃথিবী দূরত্ব মানলেও এক ষোড়শীর বরং সে দূরত্বকে গুরুত্ব না দিয়ে, ছেলেটির বন্ধুর কাছ থেকে নম্বর যোগাড় করে অনেকখানি আড়ষ্টতাকে ভুলে ফোন করে।কথা হয় দুজনের।
তারপর কতরাত চাঁদ আলো ছড়ায় আবার দিনের আলোতে মিশে যায়, নদীর স্রোতের মত সময় বয়ে যায়। মেয়েটি একটা কারন খোঁজে, একটা বাহানা খোঁজে একটুখানি কথা বলার জন্য। সেই উত্তেজনায় ছেলেটির অক্টোবরের জন্মদিন গুলিয়ে ফেলে আগস্টেই শুভেচ্ছা জানাতে ফোন করে। আবারও কথা হয় দুজনাতে।
পরবর্তীতে ক্ষন বিরতিতে মাঝে মাঝে কথা হতো ওদের। ততদিনেও আবদারের জায়গা তৈরি হয়নি বলে খুবই সংক্ষিপ্ত সময় কথা হতো তবে এর রেশ রয়ে যেত দীর্ঘক্ষণ।
একপর্যায়ে ছেলেটি মেয়েটির বান্ধবীর কাছে জানায় ‘মেয়েটিকে তার ভাল লাগে’। যথারীতি সৃষ্টির অপ্রকাশিত রহস্য থাকা সেই ব্যাপার ঘটলো। মেয়েটি ছেলেটির সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল।
এরপর সৃষ্টিকর্তা তাদের এই দূরত্ব ঘোঁচাতে নিলেন ভিন্নপথ।ছেলেটি বাইক এক্সিডেন্ট করল।এতে করে মেয়েটি শুধু ফোনই করেনি সাথে এক আকাশ বিশালতা নিয়ে নিয়মিত খোঁজখবর নিত, ওষুধ খাওয়ার কথা জানাত, মৃদু তাগাদাও দিত।
আদনান হোসেন – সাদিয়া জাহান অর্না।একত্রে ” সাদনান”।প্রথম দেখা ২০১১, ফেব্রুয়ারি/মার্চ।তখন আদনান ৮ম এবং অর্না ৭ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী।প্রথম পরিচয় হওয়ার দেড় বছর পরে আদনান-ই প্রথম প্রেম নিবেদন করেছিলো
কিন্তু নাছোড়বান্দা ছেলেটির ওষুধ খাওয়া কিংবা তার অসুস্থতার দিকে ভ্রুক্ষেপ কই? সে মেয়েটির কাছে বারবার জানতে চায় ‘মেয়েটিরও তাকে ভাল লাগে কিনা?
‘হয়তো সেই রাতে আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল, হয়তো সেই রাতে বৃষ্টি ছিল। কিংবা হয়তো ছিল না।
দিন যায়,দিন আসে। মেয়েটা কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারেনা।একটা ছেলে মনের আঙ্গিনাতে ধীরপায়েতে এক্কা দোক্কা খেলে। অবশেষে মেয়েটি একটি ব্ল্যাঙ্ক ম্যাসেজ পাঠায়। মেয়েটিকে চমকে দিয়ে ছেলেটি সাথে সাথেই তাকে প্রেম নিবেদন করে ফিরতি ম্যাসেজ পাঠায়।মেয়েটি অপেক্ষা করার কথা জানিয়ে ফোন রেখে দেয়। কিন্তু শত জনমের রাগ-অভিমান আর উচ্ছ্বাসের মিলিত স্রোতের বেগে সকল দূরত্বের বাঁধ ভেঙে যায়, প্লাবিত হয়।১৬ই নভেম্বর মেয়েটি আবারও ফোন করে, ওদের কথা হয়, ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে সময় অন্য একটি দিনে চলে যায়।
১৭ই নভেম্বর মেয়েটি ছেলেটির নিবেদিত প্রেম আহবান গ্রহণ করে।
স্বর্গের নতুন ট্রেন নতুন পথে নতুন মন্তব্যে “মনসুবা জংশন” থেকে যাত্রা শুরু করে।একদিনের এক অপরিচিতা, এক “অনামিকা” কিংবা এক “নীলপরী নীলাঞ্জনা” হয়ে ওঠে “কাছের মানুষ”।
সেই ট্রেনটা আজও চলমান। এই চলার পথ কখনো ছিল কণ্টকাকীর্ণ কখনো মসৃণ। তবু এই পথ যদি না শেষ হয় তবেই দারুণ হয়।
মেয়েটির নিজের মোবাইল ফোন ছিলনা,মায়ের ফোন থেকে কথা হতো। যেন “ল্যান্ড ফোনের দিনগুলোতে প্রেম”। ৪ই জানুয়ারি তাদের প্রথম দেখা হলো। চেনা মানুষকে দেখলো অচেনা এক গাম্ভীর্যে। দিন যেন স্বপ্নের মত করে কাটছিল। এরপর আবার দেখা হল, সে দেখা তৃতীয় কেউ একজনও দেখে ফেলল। বাধঁলো বিপত্তি,বাসায়ও জানলো। বন্ধ হলো “কথোপকথন”। মেয়ের জন্মদিনে ছেলেটি তাকে একটা ফোন কিনে দিয়েছিল। সেই ভালো সময়টুকু দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মেয়েটিকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। পরিবারের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শেষমেষ ছেলেটিও বরিশাল থেকে বাড়িতে চলে আসলো। তবে খুব একটা দেখা হতো না তাদের।
এমন কতদিন গেছে কথা বলতে বলতে রাত ভোর হয়েছে তবু কথা ফুরোয়নি। এমন করে দুজনের স্কুল-কলেজ শেষ হলো। উচ্চ শিক্ষার যাত্রা শুরু হলো। হৃদয়ের দূরত্ব না বাড়লেও বৃদ্ধি পেল অবস্থানগত দূরত্ব। ভিন্ন প্রতিষ্ঠান আর ভিন্ন জায়গায় নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়েছে। খুনসুটি কিংবা না খেয়ে থাকার মত অভিমান, আবার দিনশেষে গভীর প্রেম।তবু কেউ কাউকে ছেড়ে যাননি কখনো।
শত অভিমান ভেঙ্গে ভালোবাসা ঠিক নেমে আসে স্বর্গ থেকে।রূপকথা এখন আর হয় না তবু রূপকথার কাল্পনিক চরিত্ররা বাস্তবের জগতে ফিরে আসে বারংবার।
চোখের পানিতে যে প্রেম পূর্ণতা পায় তা বোধহয় কোন আঘাত-ই ভাঙ্গতে পারে না। শূন্যতায় পূর্ণতার নবম বছরের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
