তাওসিফ এন আকবর
চলে গিয়েও থেকে যাওয়া যায়। অশরীরী তবে অনুভবে, হৃদয়ে। সেই জন্যই বোধ হয় রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ লিখেছেন ” চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়,নয় বিচ্ছেদ “।
আজ ৮ই ডিসেম্বর ২০২১ মারুফের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে গতবছরের লেখাটা নিম্নে পুনরায় উল্লেখ করা হল।
গত হয়ে যাওয়া অনেক হারানোর সাল ২০২০।পৃথিবী ব্যাপীয়া শুধু হাহাকার। সবাই শুধু হারিয়েছে। অমন হারানোর সালটাকে পেছনে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার অপেক্ষার পালা শুরু। এইতো ডিসেম্বর আসতেই বিজয়ের মাস লিখে যে জয়ধ্বনি দিয়েছিল সবাই সেটাও শেষ হয় ১৬ তারিখে। এরপর ২৫ তারিখে বড়দিন পেরিয়ে বছরের শেষরাত্রি আর নতুন বছর।
কিন্তু ১৬ তারিখের সেই বিজয়ের দিনটি দেখা হয়নি মারুফের। পুরো নাম লিয়ন আল মারুফ। ডিসেম্বরের আট তারিখেই সন্ধ্যের আকাশটা ঘনকালো মেঘে ছেয়ে গেল। বিষন্নতার মাত্রার তীব্রতায় প্রকৃতির চোখও জলে ঝাপসা হয়ে এল, ভীষণ কুয়াশায় ছেয়ে গেল চারিপাশটা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নামের পাশে “মৃত্যুপথযাত্রী “লিখে রাখা লিয়ন আল মারুফের যাপিত জীবনের এ যাত্রা থামলো এখানেই। বাসের সাথে মোটরসাইকেল সংঘর্ষ একটা প্রক্রিয়া মাত্র। এরকম সংঘর্ষ হয়েও হাজার মানুষ বেঁচে আছে। ও বাঁচেনি।
জাগতিক সমস্ত ব্যাপারেই মানুষ সবজান্তা নয় সেখানে ভবিষ্যতব্য বিষয়াবলীর তো প্রশ্নই আসেনা। তবুও একটা কিন্তু রয়ে যায়। নইলে সেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই কেন সে লিখে রাখবে “ যখন আমি থাকবনা, তখন আমায় খুঁজো না। শুধু মনে করে একটু ভালোবাসা উড়িয়ে দিও।”
ওর ফেসবুকে দেয়া -রাত গভীরে মন খারাপ হয়, বুকে চাপা কষ্ট থাকে; এসব স্ট্যাটাসগুলো অক্ষরে অক্ষরে সত্য ওর গর্ভধারিণী মায়ের ক্ষেত্রে। ভীষণ রাতে তার কি হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়না? পাহাড়সম কষ্ট বুকে সেকি আর্তনাদ করেনা? অবশ্যই করে। বারংবার করে।
মারুফের দেয়া -“ চাওয়া বেশি হলে তুমি ঠকবেই ” স্ট্যাটাসটার সাথে অতিমাত্রায় মিল আছে ওর বাবার। কেবলমাত্র একটা ছেলেকে নিয়ে তার কতইনা চাওয়া ছিল। একমাত্র অবলম্বন ছিল। ওকে নিয়ে কতশত চাওয়ার পরে সেই ঠকলোইতো।
এসবই আমরা লোকমুখে শুনি। একটি সাঁকো পেরিয়ে দেখতে যাওয়া হয়নি আর। দেখতে যাওয়া হয়নি সন্তান হারানো মায়ের বেদনা। দেয়া হয়নি শান্তনা।পথে কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি ওর বাবাকে সে কেমন আছে।
ভালো নেই সেটা অবগত আছি। তবু মিনিটখানেক সময় বের করে তার দুঃখবোধ ভাগাভাগি করা হয়নি।
খুব করে আমরা সবাই ফেসবুক পোস্ট দিয়েছিলাম। সবাই একটা করে। পরেরদিন ভুলতে গিয়েও পাশে কেউ না কেউ আলাপ করে মনে করিয়ে দিয়েছিল। তার পরেরদিন শুনলাম মিলাদ আছে। সর্বশেষ যেদিন মিলাদ বা দোয়া মাহফিল হল সেদিন সেই যে বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে ফিরলাম আর কখনোও ওমুখোই হইনি। কি সেটাই তো?
আমরা সবাই ভুলে গেলেও দশমাস দশদিন গর্ভে অসহনীয়, (৫৭+) ইউনিট বেদনা যিনি সয়েছেন তিনি কি করে ভোলেন? যেই বাবা কাঁধে করে ঘুরেছেন, আঙ্গুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন তিনি কি করে ভোলেন? যার চলে যায় সে-ই বোঝে হায়, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা। হারানোর বেদনা।
আমাদের না হয় বন্ধু, ভাই, ছোটভাই কিংবা বড়ভাইয়ের অকাল মৃত্যু। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে তো নীল দিগন্তে হারিয়ে যাওয়া ভীষণ আক্ষেপ।
আবারও বলতে হয় সব “চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়”। তাইতো বছর ঘুরতেই মারুফের কথা সবার মনে পড়ে। চলে গিয়েও থেকে যাওয়া যেন একেই বলে।
