পেশাগত জীবনে তিনি জ্যেষ্ঠ সংবাদ চিত্রসাংবাদিক বা ক্যামেরা পারসন, যার ক্যামেরার লেন্সের ভেতর দিয়ে প্রতিদিন হাজারো খবর সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে উন্মোচিত হয়। কিন্তু ক্যামেরা ফ্রেমের বাইরে একাত্তর টেলিভিশনের এই জ্যেষ্ঠ চিত্রসাংবাদিক এবং অ্যামেচার রেডিও সোসাইটি বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক মো: শামসুল হুদা একজন নিঃস্বার্থ মানবসেবক। দৈনন্দিন পেশাগত ব্যস্ততার বাইরে সীমান্ত কিংবা দেশের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া, মানসিক ভারসাম্যহীন এবং আইনি জটিলতায় আটকে পড়া অসহায় মানুষদের খুঁজে বের করে তাদের নিজ নিজ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াকে তিনি নৈতিক দায়িত্ব ও এক পরম নেশায় পরিণত করেছেন। আধুনিক প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, গুগল অনুসন্ধান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী মানবিক নেটওয়ার্ক। এই মানবতাবাদী যোদ্ধার নিরলস প্রচেষ্টায় এখন পর্যন্ত ৬৪টি বিচ্ছিন্ন পরিবার তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের ফিরে পেয়েছে। কাঁটাতারের সীমান্ত পেরিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দেশের নাগরিকদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার এমন দুটি অনন্য মানবিক ও আইনি প্রক্রিয়ার বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. নিখোঁজের ১১ বছর পর ভারত থেকে দেশে ফিরলেন বাংলাদেশের শান্তনা
গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার উত্তর রাজিবপুর (মতান্তরে কাস্তিপুর) গ্রামের আব্দুল সালাম আকন্দের মেয়ে শান্তনা বেগম (৪৫)। ২০০০ সালে সেকেন্দার আলীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়, যিনি স্থানীয় একটি আদালতে মুহুরি হিসেবে কাজ করতেন। দাম্পত্য জীবনে তিনি চার পুত্র সন্তানের মা। বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই শান্তনার মানসিক সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। একবার তিনি নিখোঁজ হলে পরিবার তাকে বগুড়া থেকে উদ্ধার করে। এরপর কয়েক বছর স্বাভাবিক কাটলেও চতুর্থ সন্তান শাওনের জন্মের দেড় বছর পর তার মানসিক সমস্যা আবারও তীব্র আকার ধারণ করে। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে তাকে সাভারের ফ্যান্টাসি কিংডমের পাশে এক আত্মীয়ের বাসায় পাঠানো হলে সেখান থেকে প্রায় ১১ বছর আগে তিনি সম্পূর্ণ নিরুদ্দেশ হয়ে যান। এই দীর্ঘ সময়ে তার স্বামী সেকেন্দার আলী মুহুরির চাকরি থেকে অবসর নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করেন এবং চার সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
পরিবার সব আশা ছেড়ে দিলেও ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের ‘ঈশ্বর সংকল্প’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ক তপন প্রধান ভারতের কানপুরের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় শান্তনার পরিচয় শনাক্ত করেন। শান্তনা তখন মানসিকভাবে অসুস্থ থাকায় শুধু নিজের স্বামীর নাম এবং গ্রামের কথা ভাঙা ভাঙা বলতে পারতেন। তপন প্রধান বিষয়টি বাংলাদেশের সংবাদকর্মী শামসুল হুদাকে অবহিত করেন। শামসুল হুদা তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে এবং সুন্দরগঞ্জের স্থানীয় চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান মণ্ডলের সহায়তায় শান্তনার বাবা আব্দুল সালাম ও ছোট ভাই মসিদুল ইসলামের খোঁজ পান।
পরবর্তীতে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, সরকারি কাগজপত্র যাচাই-বাছাই এবং ট্রাভেল পারমিট অনুমোদনের পর অবশেষে ১১ নভেম্বর ২০২৫ বিকেলে বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে শান্তনাকে বাংলাদেশে ফেরত আনা হয়। হস্তান্তরের সময় বিজিবি, বিএসএফ, ইমিগ্রেশন পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বেনাপোল ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ার আইনি ধাপ শেষে ইমিগ্রেশন পুলিশের পরিদর্শক সাখাওয়াত হোসেন ও পোর্ট থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) খাইরুল ইসলাম শান্তনাকে ‘জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার’ নামের একটি মানবাধিকার সংস্থার কাছে এবং সীমান্তে উপস্থিত তার ছেলে সোহাগ ও বোনের হাতে তুলে দেন। দীর্ঘ এক যুগ পর হারিয়ে যাওয়া শান্তনাকে ফিরে পেয়ে তার বৃদ্ধ বাবা আব্দুল সালাম আকন্দ ও পুরো পরিবার আনন্দে অশ্রু বিসর্জন করেন।
২. পাঁচ বছর কারাভোগ শেষে ভারতে ফিরলেন বিহারের দীপক কুমার ঠাকুর
ভারতের বিহার রাজ্যের সমস্তিপুর মহকুমার সামস্তীপুর জেলার মনিহারপুর গ্রামের বাসিন্দা রাম নরেশ ঠাকুরের ছেলে দীপক কুমার ঠাকুর (৩৫) ছিলেন মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের দায়ে পিরোজপুর জেলা পুলিশের হাতে আটক হন তিনি। পিরোজপুরের আদালত তাকে চার বছরের কারাদণ্ড প্রদান করলে তাকে পিরোজপুর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রত্যাবাসন বা নিজ দেশে হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর (মতান্তরে ১৮ অক্টোবর) তাকে সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। এরপর ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর দর্শনা চেকপোস্ট দিয়ে তাকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়, কিন্তু ভারতের সীমান্তে দীপকের পরিবারের কোনো দায়িত্বশীল সদস্য বা আত্মীয় উপস্থিত না থাকায় সেবার তাকে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি এবং তাকে পুনরায় চুয়াডাঙ্গা কারাগারে ফিরিয়ে আনা হয়।
এরই মধ্যে ২০২৪ সালের ১৪ মার্চ চিত্রসাংবাদিক শামসুল হুদার সহায়তায় ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা অভিষেক কুমার নামে আরেক ভারতীয় নাগরিককে তার মা পুষ্পা দেবীর কাছে ফেরত পাঠানোর ঘটনাটি ঘটে। এর সফলতার পর চুয়াডাঙ্গা স্থানীয় অভিবাসন ও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ শামসুল হুদাকে দীপক কুমারের বিষয়টি অবগত করে এবং দীপকের মামলার নথিপত্র ও কিছু তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তার পরিবারকে খুঁজে বের করার অনুরোধ জানায়। শামসুল হুদা তথ্যপ্রযুক্তি ও গুগলের দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র ৩০ মিনিটের প্রচেষ্টায় মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে ১৭ মার্চ বিহারের মনিহারপুর গ্রামে দীপকের পরিবারের ঠিকানা ও স্থানীয় প্রশাসনের সন্ধান পান এবং দীপকের বাবার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেন।
পরিবারের সন্ধান মেলার ১১ দিন পর, ২৮ মার্চ ২০২৪ বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা এবং ভারতের গেদে বন্দরের শূন্য রেখায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে দীপক কুমার ঠাকুরকে তার পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে বিজিবির দর্শনা আইসিপি কমান্ডার সুবেদার এনামুল কবির, দর্শনা ইমিগ্রেশন ইনচার্জ এসআই আতিকুর রহমান, কাস্টমস কর্মকর্তা মোঃ জাহিদুজ্জামান ও শরীফ উদ্দিন, দর্শনা থানার এসআই ফাহিম হোসেন এবং ভারতের পক্ষে ১৩২ বিএসএফ সীমানগর ব্যাটালিয়নের স্টাফ অফিসার মেজর পি নাগা রঞ্জন, গেঁদে ক্যাম্পের কোম্পানী কমান্ডার এসি ভিটাসি, গেদে ইমিগ্রেশন ইনচার্জ জিসি দে, কাস্টমস কর্মকর্তা রামাতার পি যাদব, কৃষ্ণগঞ্জ থানার এএসআই তন্ময় দাস, ডিআইবি সাধন মন্ডল ও রেডক্রস প্রতিনিধি চিত্তরঞ্জন ন্থা উপস্থিত ছিলেন। সশরীরে উপস্থিত থেকে দীর্ঘ ৫ বছর পর নিজের সন্তানকে ফিরে পেয়ে দীপকের দরিদ্র বাবা রাম নরেশ ঠাকুর এবং দুলাভাই গৌরব কুমার সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। চিত্রসাংবাদিক শামসুল হুদা এই সফলতার পর দুই দেশের সাজাভোগকারী বন্দিদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটিকে আরও সহজতর ও স্বল্পমেয়াদী করার আহ্বান জানান।
৩. মানবিকতার আরও কিছু সীমান্তহীন দৃষ্টান্ত
শামসুল হুদার এই মানবিক তৎপরতা শুধু এই দুটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে:
সুভাষের প্রত্যাবর্তন (২০২১): নীলফামারীতে রাস্তার পাশে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ভারতীয় বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী যুবক সুভাষকে রংপুর মেডিকেল কলেজে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং দীর্ঘ সাত মাসের প্রচেষ্টায় কোনো পাসপোর্ট ছাড়াই আইনি প্রক্রিয়ায় ভারতে তার পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো।
বিজলি রায়ের মরদেহ হস্তান্তর (২০২১): নওগাঁ সীমান্তে অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হয়ে কারাগারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ভারতীয় নাগরিক বিজলি রায়ের মরদেহ আইনি জটিলতা কাটিয়ে স্বজনদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা।
নাসির উদ্ধার (২০২০): কেরানীগঞ্জের মানসিক ভারসাম্যহীন নাসির ১০ বছর আগে নিখোঁজ হয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে গেলে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে তাকে উদ্ধার করে বাংলাদেশে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা।
শেভরনের আইনি মুক্তি: নাটোর পুলিশের হাতে আটক ভারতীয় নাগরিক শেভরন অভিভাবক না থাকায় পুনরায় কারাগারে যাওয়ার উপক্রম হলে এক মাসের চেষ্টায় তার পরিবার খুঁজে বের করে আইনি কারাগার থেকে মুক্ত করা।
ব্যক্তিগত স্তরে সামাজিক সহায়তা: ২০১৮ সালে সৈয়দপুরের এক অসচ্ছল ও দুস্থ নারীকে হুইলচেয়ার প্রদান এবং কিশোরগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারিয়ে জীবন নিয়ে চরম হতাশায় ভোগা শিশু হাবিবাকে মানসিক ও সামাজিক অভিভাবকত্ব প্রদান করে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখানো।
তথ্যসূত্র ও ক্রেডিট:
এই প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্যের উৎস হিসেবে নিম্নোক্ত গণমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত সংবাদ ও ফিচার প্রতিবেদন ব্যবহার করা হয়েছে:
১. দৈনিক যুগান্তর
২. দৈনিক ইনকিলাব
৩. সময় নিউজ
৪. ঢাকাপ্রকাশ
৫. বাংলানিউজ২৪
৬. দ্য ডেইলি মর্নিং গ্লোরি (The Daily Morning Glory)
৭. দৈনিক গণমুক্তি
