গভীর প্রেম থেকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে
গোপনে তালাক দিলেও চাকরি রক্ষার জন্য স্ত্রীকে রেখেছেন নিজ বাড়িতে, কিন্তু দেননি ভরণপোষণ, ভালো-মন্দের খবরও নেননি * জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত
ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করার পরও স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিচ্ছেন না প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। পদে পদে করেছেন শুধু অবজ্ঞা আর অবহেলা।
স্ত্রীর ভালো-মন্দের খোঁজ নেওয়া তো দূরের কথা, গোপনে তালাক পর্যন্ত দিয়েছেন। আবার চাকরি রক্ষার্থে তালাক দেওয়া স্ত্রীকে নিজের গ্রামের বাড়িতে পিতামাতার জিম্মায় রেখেছেন। চরম অসদাচরণের মতো গুরুতর এমন অপরাধ করেছেন সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইউসুফ। যিনি বর্তমানে গোপালগঞ্জ ডিসি কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার পদে কর্মরত।
প্রশাসন ক্যাডারের ৩৭তম বিসিএসের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তার ভুক্তভোগী স্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গত রোববার কমিটির জমা দেওয়া রিপোর্টে বিচার্য বিষয়ের তিনটি অভিযোগই প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। দায়িত্বশীল সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, শিগগির তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হবে।
তদন্ত রিপোর্টের এক স্থানে বলা হয়েছে, ‘সরকারি একজন কর্মকর্তা বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তার কাছে এহেন আচরণ কাঙ্ক্ষিত নয়। ভুক্তভোগী নারী যাকে ভালোবেসে একদিন ঘর ছেড়েছেন, পরিবার ও সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন, সেই মানুষটি (কর্মকর্তা) তাকেই আবার দিনের পর দিন অবহেলা করেছেন।’
প্রসঙ্গত, ভুক্তভোগী নারীর গ্রামের বাড়ি বগুড়া। তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ইডেন মহিলা কলেজে লেখাপড়া শেষ করেন। ২০১৩ সালে ইউসুফের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে এক পর্যায়ে নিজেদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
মোহাম্মদ ইউসুফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স শেষ করে প্রথমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে চাকরিতে যোগ দেন। পরে ২০১৮ সালে ৩৬তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে চাকরির সুযোগ পান। পুলিশে চাকরিরত অবস্থায় পুনরায় তিনি ৩৭তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন। ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর তাকে ঢাকা কালেক্টরেটে প্রথম পোস্টিং দেওয়া হয়। পরে তিনি পোস্টিং পান গোপালগঞ্জ ডিসি কার্যালয়ে।
এর আগে ইউসুফ তার প্রেমিকাকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করেন ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট। শিক্ষা প্রকল্পে কর্মরত থাকাবস্থায় ২০১৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরের কর্মস্থলে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে ৪ লাখ টাকা কাবিনে মুসলিম রীতিতে পুনরায় বিয়ে করেন।
এ বিয়ের অনুষ্ঠানে ইউসুফের বাবা, মা, বোন, বোন জামাই, নানু এবং মামাতো বোনসহ পরিবারের আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। অথচ বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় ২০২০ সালের ১৮ ডিসেম্বর ডিসির কাছ থেকে মৌখিক ছুটি নিয়ে ঢাকায় এসে স্ত্রীকে ডিভোর্স লেটার পাঠান ইউসুফ। যদিও ওই ডিভোর্স লেটার স্ত্রী গ্রহণ করেননি।
ডিসি অফিসের বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, ভুক্তভোগী নারীর লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক তদন্তের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-৩ শাখা থেকে গত ১৯ জানুয়ারি ২ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান যুগ্মসচিব (সওব্য) জায়েদা পারভীন। কমিটিকে তিনটি অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধান করতে বলা হয়।
প্রথমত, ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করেছেন কিনা, দ্বিতীয়ত, স্ত্রীর মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে স্বামী অন্য কোনো সম্পর্কে জড়িয়েছেন কিনা? তৃতীয়ত, স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছেন কিনা?
তদন্ত রিপোর্টের সার্বিক মন্তব্য : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে পরিচয় থেকে প্রেম, প্রণয় এবং সবশেষে তাকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউসুফ।
পরে চাকরিসূত্রে চাঁদপুরে অবস্থানকালীন ধর্মান্তরিত স্ত্রীর সঙ্গে ছেলের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে মুসলিম রীতিতে বিয়ে হয়। বিয়ের পর পুলিশের চাকরি এবং সবশেষে প্রশাসন ক্যাডারের চাকরিতে যোগ দেন ইউসুফ। এ সময়গুলোতে স্ত্রীকে নিজের পিতা-মাতার তত্ত্বাবধানে রেখেছেন। কিন্তু তার স্ত্রীর কোনো ভরণপোষণ দেননি। এমনকি তাকে স্ত্রীর মর্যাদাও দেওয়া হয়নি। ছেলের বাবা, মা এবং তিনি নিজেদের মান-মর্যাদা রক্ষাসহ চাকরি রক্ষার্থে গোপনে ও সুকৌশলে স্ত্রীকে বাবা-মায়ের কাছে রেখে ডিভোর্স বা তালাক দেওয়ার কাজটি সম্পন্ন করেন।
রিপোর্টে বলা হয়, ধর্মান্তরিত এবং নিজ পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন একজন শিক্ষিত, সুন্দরী ভদ্রমহিলা সবকিছু সহ্য করে স্বামীকে ফেরত পাবেন এবং তার সঙ্গে সংসার করবেন, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে থাকবেন, এমন আশায় এহেন অবজ্ঞা, অবহেলার মধ্যেও অজানা অচেনা পরিবারে বিগত ১-২ বছর কাটিয়েছেন। সরকারি একজন কর্মকর্তা বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তার কাছে এহেন আচরণ কাঙ্ক্ষিত নয়। কী নির্মম!
ভুক্তভোগী নারী যাকে ভালোবেসে একদিন ঘর ছেড়েছেন, পরিবার ও সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন, সেই মানুষটি (কর্মকর্তা) তাকেই আবার দিনের পর দিন অবহেলা করেছেন। স্ত্রীর মর্যাদা ও ভরণপোষণ দেওয়া তো দূরের কথা, তার ভালো-মন্দের খোঁজখবরও রাখেননি। ফলে কতটা মনোকষ্টে ছিলেন বা আছেন এই ভুক্তভোগী নারী- তা মানুষ মাত্রই উপলব্ধি করতে পারে।
এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদের নোটিশ পাঠিয়েও নিজের বাড়িতে নিজ পিতা-মাতার তত্ত্বাবধানে এখন পর্যন্ত অভিযোগকারী ভুক্তভোগী নারীকে থাকার অনুমতি দিয়েছেন। তার পিতা-মাতার আচরণও বিচিত্র এবং প্রশ্নাতীত নয়।
রিপোর্টের মন্তব্যে আরও বলা হয়, একজন বিবাহিত মহিলা তার স্বামীর অবজ্ঞার পাত্র হয়ে ২ বছর শ্বশুরবাড়িতে শ্বশুর-শাশুড়ির আশ্রয়ে থেকেছেন। তার স্বামী তার খোঁজখবর নেননি। তাকে সবকিছুর জন্য ইউসুফের পিতা-মাতার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। অথচ তিনি পিতা-মাতা ও নিজের ধর্মকে ত্যাগ করে যে স্বামীর ভরসায় সমাজ ছেড়েছিলেন, সে স্বামীই তাকে ত্যাগ করে বসে আছে।
এমন সব তৎপরতা তাকে যে আত্মহত্যার পথে ধাবিত করতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। অভিযোগকারী নারী আত্মহত্যা করেননি সত্য, তবে আত্মহত্যা করার মতো পরিবেশে থেকেই তিনি তার জীবনের এ কঠিন সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে সাহায্য চেয়েছেন। এছাড়া অভিযোগকারী নিজ হাতে অভিযোগ লেখেননি বা নিজে স্বাক্ষর করেননি- এমন প্রশ্ন তদন্ত কমিটির কাছে অবান্তর মনে হয়েছে।
কারণ স্বামী পরিত্যক্ত একজন মহিলার পক্ষে তার শ্বশুর-শাশুড়ির আশ্রয়ে থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব ছিল না। সে কারণে ভুক্তভোগী মেয়ের অনুরোধে তার পিতা অভিযোগপত্র তৈরি করে প্রতিকার চেয়ে তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পেশ করেছেন।
সবশেষে তদন্ত কমিটি সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইউসুফ অভিযোগকারী নারীকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করেছেন।
এরপর বিবাহিত স্ত্রীকে অবজ্ঞা, অসম্মান করে তাকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন। এর ফলে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়া সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টিও প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
মোহাম্মদ ইউসুফের বক্তব্য : এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার স্ত্রীকে আমি অনেক আগে তালাক দিয়েছি। তালাকের পর তিনি আমার পিরোজপুরের গ্রামের বাড়িতে ছিলেন না। ঢাকায় চলে আসেন। এছাড়া গত ১ মার্চ দেনমোহরের ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। টাকা পরিশোধসহ এ বিষয়ে একটি আপস-মীমাংসাও হয়েছে। তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী তার বাবার সঙ্গে চলে গেছেন।’
কৃতজ্ঞতা
দৈনিক যুগান্তর
