১৫ টি মহিলা আসনের ৫ নং আসন (খুলনা জেলা এবং বাকেরগঞ্জ জেলার তৎকালীন পিরোজপুর সাব ডিভিশন)এর বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি-বিধির ২২৫ বিধি অনুসারে ২২৬ বিধিতে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ‘বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির তালিকায় ৯ নম্বর সদস্য ছিলেন
সংসদ সদস্য –ফরিদা রহমান
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রথম জাতীয় সংসদে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যরা জাতীয় পর্যায়ে এবং নারী অধিকারের ক্ষেত্রে কার্যকর ও গতিশীল ভূমিকা রেখেছেন।
১৯৭৩-এর ৭ এপ্রিল থেকে ১৯৭৫ সালের ১৭ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য নারীর ক্ষমতায়নে বা রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসাবে বিবেচিত হয়েছে।
১৯৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ‘মেম্বার অব দি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি’তে পূর্ব পাকিস্তানে সংরক্ষিত নারী আসনে ৭ নারী সদস্য মনোনীত হন। প্রাদেশিক পরিষদে ১০ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। নারী সংসদ সদস্যরা আওয়ামী লীগ দলের মনোনয়নে মনোনীত হন।
জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে জনগণের নিরঙ্কুশ ভোটে আওয়ামী লীগের জয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আঁতকে উঠেছিল। প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করেন।
প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় অধিবেশন স্থগিত করায় সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদেরও অধিবেশনে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। একাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে বাংলাদেশের সংবিধানের রূপরেখা ঘোষণা করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রথম জাতীয় সংসদ ১৯৭৩-এর ৭ এপ্রিল থেকে ১৯৭৫ সালের ১৭ জুলাই পর্যন্ত। ১৯৭৩ সালের মার্চে প্রকাশিত গেজেটে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সংরক্ষিত ১৫টি আসনের জন্য নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।
নির্বাচিত এলাকার সংরক্ষিত আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীতরা ছিলেন- বেগম তসলিমা আবেদ মহিলা আসন-১, রংপুর জেলা, নাজমা শামীম লাইজু মহিলা আসন-২, দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলা, জাহানারা রব মহিলা আসন-৩, বগুড়া ও পাবনা জেলা, বদরুন্নেছা আহমেদ মহিলা আসন-৪, যশোর ও কুষ্টিয়া জেলা, ফরিদা রহমান মহিলা আসন-৫, খুলনা জেলা এবং বাকেরগঞ্জ জেলার পিরোজপুর সাব ডিভিশন, আজরা আলী মহিলা আসন-৬, বাকেরগঞ্জ ও পটুয়াখালী জেলা, রাফিয়া আখতার মহিলা আসন-৭, টাঙ্গাইল জেলা ও ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর সাব-ডিভিশন, খুরশীদা ময়েজউদ্দিন মহিলা আসন-৮, ময়মনসিংহ জেলা, সাজেদা চৌধুরী মহিলা আসন-৯, নারায়ণগঞ্জ সাব ডিভিশন এবং ঢাকা জেলার ঢাকা সদর সাব ডিভিশন, বেগম নূরজাহান মুরশিদ মহিলা আসন-১০, ঢাকা জেলা এবং ঢাকা সদর সাব ডিভিশন, শ্রীমতি কণিকা বিশ্বাস মহিলা আসন-১১, ফরিদপুর জেলা, আবেদা চৌধুরী মহিলা আসন-১২, সিলেট জেলা, মমতাজ বেগম মহিলা আসন-১৩, কুমিল্লা জেলা, আর্জুমান্দ বানু মহিলা আসন-১৪, কুমিল্লা জেলার চাঁদপুর সাব ডিভিশন এবং নোয়াখালী জেলা, শ্রীমতি সুদীপ্তা দেওয়ান মহিলা আসন-১৫, চট্টগ্রাম জেলা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা।
বাংলাদেশ প্রথম জাতীয় সংসদে ৮টি অধিবেশনের কার্য দিবস ছিল ১৩৪ দিন। এই কার্য দিবসগুলোতে মহিলা আসনের সংসদ সদস্যরা জাতীয় পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন।
ফরিদা রহমান (মহিলা আসন-৫)
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি-বিধির ২২৫ বিধি অনুসারে ২২৬ বিধিতে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ‘বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির তালিকায় ৯ নম্বর সদস্য ছিলেন ফরিদা রহমান।
জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১৯৭৩-এর ১৪ জুন নবম বৈঠকে রেল বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন। ফরিদা রহমান স্পিকার এবং সংসদ সদস্যদের মনোযোগ আকর্ষণ করে কয়েকটি দিকনির্দেশনা দেন। তিনি বলেন,
বিনা টিকিটে রেলে ভ্রমণ বন্ধ করা এবং রেলওয়ে সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকার জনগণের যে সহযোগিতা চেয়েছে, সেটির জন্য কর্মসূচির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হবে। শুধু আবেদন-নিবেদন এ ব্যাপারে কতখানি কার্যকর হবে, সেটি সন্দেহের ব্যাপার। বিনা টিকিটে রেলে ভ্রমণ করার প্রবণতা কোন শ্রেণির লোকের মধ্যে বেশি, তার একটি সঠিক সমীক্ষা হওয়া দরকার এবং এই সমীক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো প্রতিরোধ-ব্যবস্থা রেল কর্তৃপক্ষ যদি গ্রহণ করেন, তাহলে নিশ্চয়ই জনগণ তার সঙ্গে সহযোগিতা করবে।
জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১৯৭৩-এর ২১ জুন পঞ্চদশ বৈঠকে তারকাচিহ্নিত প্রশ্ন ও উত্তরে মিসেস ফরিদা রহমান মন্ত্রী আবদুল মান্নানের কাছে জানতে চান,
এ পর্যন্ত কতজন শিশুকে বিদেশিদের কাছে অ্যাডপশন করার জন্য দেওয়া হয়েছে? এখানে ওইসব বিদেশিদের জন্য কোন সংস্থা এজেন্ট হিসাবে বাংলাদেশে কাজ করছে?
জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১৯৭৩-এর ২২ জুন ষোড়শ বৈঠকে সংসদ বিতর্কের তারকাচিহ্নিত প্রশ্ন ও উত্তরে তিনি বলেন,
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করে বলবেন কি, কতগুলো রাষ্ট্র বাংলাদেশে দূতাবাস স্থাপন করিয়াছে? তিনি বিদেশি বৃত্তি প্রসঙ্গে আরও বলেন, শিক্ষা বিভাগের মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করে বলবেন কি- ক. বিদেশে অধ্যয়ন করার জন্য এ পর্যন্ত কতগুলো বিদেশি বৃত্তি পাওয়া গিয়েছে। খ. উক্ত বৃত্তিগুলোর মধ্যে কতগুলো সমাজতান্ত্রিক দেশ থেকে পাওয়া গিয়েছে। বিদেশ থেকে প্রাপ্ত এই বৃত্তিগুলো হতে ছাত্রীদের জন্য কতগুলো দেওয়া হয়েছে। ঘ. বিদেশে অধ্যয়ন করার জন্য সরকার থেকে কোনো বৃত্তি দেওয়া হয় কিনা? ঙ. যদি (ঘ) প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ-সূচক হয়, তবে এ পর্যন্ত কতটি বৃত্তি দেওয়া হয়েছে এবং এতে কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে। চ. (ক) ও (খ) প্রশ্নের জেলাওয়ারী হিসাব কী?
জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের ১৯৭৩-এর ২৬ সেপ্টেম্বর দশম বৈঠকে বাংলাদেশ গার্ল গাইডস সমিতি বিল ১৯৭৩ উত্থাপন প্রসঙ্গে তিনি স্পিকারকে বলেন,
গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এ প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি সংগঠন রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস লন্ডনে অবস্থিত। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশন একটি প্রাদেশিক প্রতিষ্ঠানরূপে কাজ করত। পৃথিবীর সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে গার্ল গাইডসের বিশেষ প্রসার নেই কিন্তু এ দেশের স্কুল-কলেজের মেয়েরা তাদের পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও সহপাঠ্য হিসাবে গার্ল গাইডকে একটা প্রশস্ত ক্ষেত্র হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান মেয়েদের একটা সুষ্ঠু নীতি এবং সংঘবদ্ধ জীবন সম্বন্ধে জ্ঞানদান করে। গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশন-এর নীতি, উদ্দেশ্য ও আদর্শ বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কাছে কল্যাণকর মনে হওয়ায় বাংলাদেশ সরকার এটিকে শিক্ষার একটি অঙ্গ হিসাবে বিবেচনা করেছে।
তিনি আরও বলেন, গার্ল গাইড সম্বন্ধে আমাদের দেশে একটি বিরূপ মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। তার কারণ গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশন-এর উদ্দেশ্য এবং আদর্শ সম্বন্ধে তারা বিশেষভাবে কিংবা পুরোপুরিভাবে ওয়াকিবহাল নয়। গার্ল গাইডস-এর লক্ষ্য হলো নিজের সহযোগিতা, অন্যের কাছে সাহায্য ভিক্ষা নয় এবং তুমি নিজের সহযোগিতা নিজেই অর্জন কর। অর্থাৎ গার্ল গাইডস মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার শিক্ষাদান করে। আজকে বাংলাদেশের মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার বিশেষ প্রয়োজন আছে সে জন্য শিক্ষার সর্বস্তরে গার্ল গাইড; অ্যাসোসিয়েশন-এর ব্যাপক প্রসার লাভ করা দরকার। এটি কোনো বিলাসিতা নয়। আজকে এ বিল সংসদে উপস্থিত করাটা অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং যুক্তিযুক্ত হয়েছে।
কৃতজ্ঞতাঃ
দৈনিক যুগান্তর
