লেখাটি নেওয়া হয়েছে তাওসিফ এন একবর এর ফেসবুকে পোস্ট থেকে :
- ২০০১ সালে প্রথমবার প্রার্থী হয়েই বিজয়ী হয়েছিলেন ২২ বছর বয়সে
- এরপর টানা ৫ম বার ইউপি নির্বাচনে বিজয়ী হন ২০২১ সালে
- সম্প্রতি প্যানেল চেয়ারমান নির্বাচিত হয়েছেন
- সামলাচ্ছেন চেয়ারম্যানের (ভারপ্রাপ্ত) দায়িত্বও
- মেয়াদকাল শেষ হলে একটানা ২৬ বছর দায়িত্ব পালন করার রেকর্ড গড়বেন
১৮৭০ সালে ব্রিটিশের সময়ে চৌকিদারি আইন প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রথম স্থানীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলর প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার আরম্ভ হয়েছিলো। স্থানীয় সরকারের এ প্রাথমিক স্তরটি খুবই প্রাচীন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খাঁন তার রচিত ও প্রদত্ত শাসনতন্ত্রে ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্যদের দিয়েই ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ গঠন করেছিলেন।পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ৪০ হাজার করে সর্বমোট ৮০ হাজার সদস্য নির্বাচিত হতো প্রত্যক্ষ ভোটে আর তারাই ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং তারাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতেন। এ প্রথাকে বলা হতো বেসিক ডেমোক্রেসি।
এর আগে কিন্তু প্রত্যক্ষ ভোটেই সব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে ১৯৫৪ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের কোনও শাসনতন্ত্র ছিলো না। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন দিয়েই পাকিস্তান চলতো। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান গণ-পরিষদে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়েছিলো। ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র গৃহীত হওয়ার পর পরই প্রত্যক্ষ ভোটে ইউনিয়ন কাউন্সিলের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। পরিষদের প্রধানকে প্রেসিডেন্ট বলা হতো।
১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত বহাল ছিলো। এই শাসনতন্ত্রের ভিত্তিতে ১৯৫৮ এর ডিসেম্বর মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কর্মসূচি ছিলো কিন্তু ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি জেনারেল আইয়ুব খাঁন দেশে সামরিক শাসন জারি করে ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র বাতিল করে দিয়েছিলেন। ১৯৬২ সালে তার প্রদত্ত শাসনতন্ত্র বহাল হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশে সামরিক শাসন বহাল ছিলো।
তখন দেশে কোনও রাজনৈতিক দল ছিলো না। রাজনীতিও নিষিদ্ধ ছিলো। ১৯৬২ সালের শাসতন্ত্র কোনও গণ পরিষদ রচনা করেনি। এটি আইয়ুবের এক ব্যক্তির রচিত ও প্রদত্ত শাসনতন্ত্র ছিলো। আইয়ুবের ভাষ্য অনুসারে সাধারণ মানুষ ভোটের অধিকার প্রয়োগের উপযুক্ত ছিলো না বলে প্রত্যক্ষ ভোট ব্যবস্থা রহিত করে বেসিক ডেমোক্রেসি প্রথা চালু করেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের জন্মের পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ গণ-পরিষদ গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র রচনা করে। এই শাসনতন্ত্র গৃহীত হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে নব-প্রণীত শাসনতন্ত্রের ভিত্তিতে প্রত্যেক্ষ ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশে সব স্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ছিলো। কোনও সময়েই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দলভিত্তিক হয়নি। পূর্বে সমাজে কিছু শক্তিশালী লোকের বিচরণ ছিলো। তারাই সাধারণত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করতেন। তাদের ৮০% লোক নির্দলীয় লোক ছিলেন। চকিদার/দফাদার ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা দেখাশোনা করার জন্য কোনও লোক ছিলো না। কিন্তু শক্তিশালী লোকগুলোর কারণে সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় থাকতো। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের অভ্যূদয় হওয়ার পর এ শ্রেণির লোকগুলো বিভিন্ন কারণে উচ্ছেদ হয়ে যায়। বাংলাদেশ সৃষ্টি ও এর পূর্ব সময়ের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে এমনই তথ্য পাওয়া গেছে অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনে ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে।
তবে ইতিহাস যেমনই হোক সরকারি কাঠামোর সর্বশেষ ধাপের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বকারী এই স্থানটি একসময়ে খুবই সম্মানজনক হিসেবে বিবেচিত হতো। সময়ের পরিক্রমায় কিছুটা ফিকে হলেও তবু এই পদের বিপরীতে লড়াইটা এখনও জমে উঠে গ্রামে, পাড়ায় এবং মহল্লায়।
অন্যান্য জনপ্রতিনিধিত্বকারী পদগুলোর তুলনায় নাগরিকের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততার সুযোগ বেশি থাকায় জনগণের আস্থা আর অভিযোগও থাকে তুলনামূলক বেশি। ফলশ্রুতিতে দীর্ঘ মেয়াদে নাগরিকদের অবস্থানের প্রতিফলনের ভিত্তিতে এই পদে বহাল থাকা তথা বারবার নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস অন্তত অন্য ক্ষেত্রের চেয়ে কিছুটা কম দেখা যায়। তবুও কেউ কেউ সকল বাঁধা উপেক্ষা করে কেবল নাগরিকদের দ্বারা, নাগরিকদের তরে এবং নাগরিকদের জন্যই নিবেদিত ও আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন।
২০২১ সালের ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের একজন ইউপি সদস্য আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার। টানা পঞ্চমবার নির্বাচিত হয়ে ইতোমধ্যে ২৪ বছর ধরে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন। মেয়াদকাল পূর্ণ হলে ২৬ বছর ধরে প্রতিনিধিত্ব করার রেকর্ড করবেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে তথ্যগুলো তিনি নিজেই জানিয়েছেন।
বিভিন্ন মাধ্যমের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই উপজেলায় জীবিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে তিনিই এখন এক নাগাড়ে সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে জনপ্রতিনিধিত্ব করছেন।
কেন এমন পেশায় এসেছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার জানান, তাঁর বাবা-চাচা এমনকি শশুরও জনপ্রতিনিধি ছিলেন। তাদের দেখেই তিনি এই জনসেবামূলক পেশায় আসার জন্য অনুপ্রাণিত হোন। ইউপি সদস্য থেকে প্যানেল ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার ২০ বছর পর আরো বৃহৎ পরিসরে মানুষের সেবা করতে চান। গণ-মানুষেরও তাকে নিয়ে একই প্রত্যাশা বলে তার বিশ্বাস।
আলাপচারিতায় এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। তবে সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই পরিবর্তন হওয়ায় তরুণদের এই পেশায় না আসার পক্ষে মত তার।
এছাড়াও পরলোকগত হয়েছেন এমন জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে, উপজেলার সেউতিবাড়িয়া গ্রামের মরহুম আব্দুস সালাম তালুকদার একটানা ৭ বার তথা ৩৫ বছর জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন তাঁর ছেলে রাসেল তালুকদার। এদিকে কালাইয়া গ্রামের মরহুম মোদাচ্ছের আলী শিকদার ৫ বারে একটানা ২৫ বছর জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই প্রতিবেদককে এমনটাই জানিয়েছেন তাঁর ছেলে মো: সোলায়মান শিকদার।
